রুডইয়ার্ড কিপলিং
রুডইয়ার্ড কিপলিং (Rudyard Kipling) জন্ম : ১৮৬৫ মৃত্যু : ১৯৩৬ শৈশব কেটেছে তাঁর নিদারুণ অব্যবস্থার মধ্যে। যে দিনগুলোতে আমরা উড়ন্ত প্রজাপতির সন্ধানে নির্ভাবনায় ছুটে বেড়াই, নীল আকাশের নীচে হঠাৎ জাগা রামানুর সাতরঙ দেখে আনন্দে অধীর হয়ে যাই, বন্ধুদের সাথে খেলি এক্কা দোক্কা- সেই বয়েসে তাঁকে কায়িক পরিশ্রম করতে হয়েছে, এক নির্মম অভিভাবকের ফাই- ফরমাস খাটতে হয়েছে। এইভাবে চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে মুছে গেছে দিগন্তের রঙ । তবু তিনি হার মানেননি । বন্ধুরা বলো তো, আমি কার কথা বলছি? তোমরা শুনলে অবাক হবে, তিনি হলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং, যিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে । আর, কিপলিং-এর কথা বললেই মনে পড়ে যায় মুগলির কথা। সেই মুগলি, জংলি ছেলেটি, কীভাবে জন্তু-জানোয়ারদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছিল। মুগলি হল কিপলিং-এর সবথেকে চিত্তাকর্ষক চরিত্র। 'দি জঙ্গল বুক' নামে একটি বইয়ের মধ্যে মুগলির গল্পকথা তিনি শুনিয়েছেন অসাধারণ দক্ষতায়। এসো, আমরা কিপলিং-এর ছোট্টবেলার গল্প বলি। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে ডিসেম্বর জন্ম হয়েছিল তাঁর আরব বন্দিতা বোম্বে শহরে। একেবারে ছোটোবেলার দিনগুলি তিনি সেখানেই কাটিয়ে ছিলেন। সেই শৈশবের কথা খুব একটা মনে নেই তাঁর। কারণ পাঁচ বছর বয়েসে তাঁকে ইংল্যাণ্ডের সাউথ সি-র একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল। আর তখন থেকেই কিপলিং-এর ভাগ্যাকাশে ঝড়ের ইশারা, কালো মেঘের আনাগোনা। থাকতে হত তাঁকে দূর সম্পর্কের এক কাকার কাছে। ভীষণ নির্মম আর হৃদয়হীন ছিলেন ওই ভদ্রলোক । সকাল থেকে রাত অব্দি বেচারি কিপলিং-কে নানা ধরনের সাংসারিক কাজ করতে হত। কখনও ক্লান্ত হলেও তিনি মুখে তা প্রকাশ করতে পারতেন না । মা নেই, বাবা নেই, কার কাছে জানাবেন হৃদয়ের এই আকূল আর্তির কথা! তবু দিন কাটতে থাকে, বসন্ত আসে, মার্চ-এপ্রিল, রডোডেনড্রন কেমন যেন রঙিন হয়ে ওঠে, লাইলার্ক বলে, এবার আনন্দ করার সময়। বেচারি কিপলিং-এর ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা দেয় না। এভাবেই দেখতে দেখতে আরও সাতটি বছর কেটে গেল। তখন তিনি বছর বারোর এক বালক। তাঁকে পাঠানো হল ইউনাইটেড সার্ভিসেস কলেজে। সেখানে গিয়ে পড়াশোনাতে মন দিলেন বালক কিপলিং। মুক্তি মিলল। এখানে তো আর কাকার রক্তচোখের ভয়ে সব সময় তটস্থ হয়ে থাকতে হয় না। বন্ধুবান্ধবেরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল । গড়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, আর সেখানে কবিতা আবৃত্তি কিংবা প্রবন্ধ রচনাতে রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর আসন সবার আগে । সেই বয়েস থেকে তিনি মন দিয়ে পড়াশোনা করতেন। পড়তে ভালোবাসতেন সবরকমের সাহিত্য। শুধু ইংরেজি নয়, জার্মান এবং ফরাসি সাহিত্যের সেরা লেখাগুলিও পড়ে ফেলেছিলেন। অবশ্য ইংরাজি অনুবাদের মাধ্যমে। পাঁচটি বছর সেখানে কাটাবার পর সতেরো বছর বয়সে তিনি এলেন ভারতে। পৃথিবীটা ইতিমধ্যে অনেকখানি পাল্টে গেছে। শৈশবের সেই সারল্য কোথায় হারিয়ে গেছে। কৈশোরের রাজ্যে প্রবেশ করেছেন রুডইয়ার্ড কিপলিং। পৃথিবী এখন অনেক দূর দিগন্ত পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হয়েছে। এখন সবকিছুর অন্তরালে কী এক অদ্ভুত রহস্য ঘুরে বেড়ায়। জানতে হবে অনেক কিছু। বুঝতে হবে, আত্মস্থ করতে ভবিষ্যতের এক সৎ, শোভন, সুন্দর নাগরিক হয়ে উঠতে হবে- এটাই তখন কিপলিং-এর মনোগত বাসনা । হবে, চাকরি পেলেন তিনি লাহোরের এক সাময়িকপত্রে-সিভিল অ্যাণ্ড মিলিটারি গেজেট। কিশোর কিপলিং হয়েছেন সংবাদপত্রের প্রতিনিধি। ভাবতেই পারা যায় না, তখন থেকেই লেখায় হাতেখড়ি হয়ে গেল তাঁর এবং পাইওনীয়ার নামে একটি পত্রিকাতে বেশ কিছু প্রবন্ধ আর গল্প প্রকাশিত হল কিপলিং-এর। এভাবেই কখন একদিন ফুড়ুৎ পাখি হয়ে হারিয়ে গেল তাঁর ছোটোবেলা। এবার বহির্জগত কিপলিংকে ডাক দিয়েছে। আরও বড়ো হতে হবে তাঁকে। ছোটোবেলার অনুভূতিগুলিকে মনে রাখতে হবে। সাজাতে হবে শব্দনিচয়। পৌঁছে দিতে হবে পাঠক সাধারণের হৃদয়ের দরবারে। দেখতে দেখতে সত্যি এক বিশিষ্ট সাহিত্যিক হয়ে উঠেছিলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং। যারই ফলশ্রুতিতে তাঁর এই নোবেল প্রাপ্তি । মূলতঃ অরণ্য কেন্দ্রিক লেখনীর স্বীকৃতিতে তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয় । নোবেল পদক প্রদানের সময় তাঁকে যে উৎসর্গপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেখানে কিপলিং সম্বন্ধে বলা হয়েছিল- তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি, কল্পনার মৌলিকত্ব, বিষয় নির্বাচনের বৈচিত্র্য এবং উল্লেখযোগ্য প্রতিভাই তাঁকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। আমরা জানি না, দূর শৈশবের ব্যথার্ত দিনগুলি কখনও মধ্যরাতে কিপলিং-এর মনে করুণ বেহালায় বিষণ্ন রাগিণী হয়ে বেজে উঠতো কিনা। হয়তো এভাবেই মুষ্ঠিবদ্ধ দুটি হাত তিনি তুলে দিতেন আকাশের দিকে এবং মনে মনে উচ্চারণ করতেন সেই কঠিন শপথ, যা তাঁকে ইস্পাত দৃঢ় এক ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল ।

ENGLISH VERSION

**Rudyard Kipling** Born: 1865 Died: 1936 Rudyard Kipling's childhood was marked by hardship and disorder. The carefree days of chasing butterflies, marveling at rainbows under a vast blue sky, and playing games with friends were far from his reality. Instead, he endured physical labor and the commands of a harsh guardian. The vibrant hues of the horizon gradually faded from his young eyes. Yet, Kipling did not give up. Do you know whom we are speaking about? You might be surprised to learn that this is Rudyard Kipling, the writer who won the Nobel Prize in Literature in 1907. And when Kipling's name is mentioned, the first thing that comes to mind is Mowgli—the wild child who befriended animals. Mowgli, Kipling's most captivating character, comes to life in his famous book, *The Jungle Book*, a masterpiece of storytelling. Let’s revisit Kipling’s early years. Born on December 30, 1865, in Bombay (now Mumbai), India, he spent his earliest years there. However, Kipling hardly remembered those carefree days. At the tender age of five, he was sent to a primary school in Southsea, England. From then on, dark clouds loomed over his fate. He lived under the guardianship of a distant uncle, a man of great cruelty and coldness. From morning to night, young Kipling was tasked with household chores. Even when he was exhausted, he could not express his distress. With no parents around to confide in, he endured silently. Seasons passed—spring arrived, painting the rhododendrons in vibrant colors, and the lilacs called for joy—but Kipling’s life saw no change. After seven long years, now a twelve-year-old boy, Kipling was sent to the United Services College. Here, his life took a turn for the better. Free from the tyranny of his uncle, Kipling focused on his studies. Friends lent him support, and a cultural environment emerged where Kipling excelled in poetry recitation and essay writing. From a young age, he displayed a passion for literature, devouring works not only in English but also in German and French, albeit through translations. After five years at the college, Kipling returned to India at seventeen. By then, the world around him had transformed, and the innocence of childhood was lost. As he entered adolescence, Kipling’s vision expanded, filled with a sense of wonder and mystery. He felt a strong urge to understand the world and mold himself into an honorable and cultured individual. In Lahore, he secured a job at the *Civil and Military Gazette*, marking the beginning of his writing career. Soon, Kipling became a contributor to another publication, *The Pioneer*, where his essays and stories began to appear regularly. Thus, his childhood slipped away, replaced by the call of the wider world. Kipling preserved his childhood memories, weaving them into words that reached the hearts of readers everywhere. In time, Rudyard Kipling became a distinguished writer, and his achievements culminated in the Nobel Prize in 1907. The recognition primarily honored his writings centered on nature and the wilderness. During the Nobel ceremony, the citation praised Kipling for his keen observational skills, originality of imagination, diversity of themes, and remarkable talent, qualities that set him apart. We can only wonder if those sorrowful days of his distant childhood ever echoed in Kipling’s mind as melancholic notes on a violin. Perhaps, during such moments, he silently raised his clenched fists to the sky, vowing to transform his pain into strength—a promise that turned him into the resolute and remarkable individual we remember today.